মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ডোমার এর ভাষা ও সংষ্কৃতি

 

ভাষা ও সংস্কৃতি

 

ডোমার এর  ভাষা

 

 

 

আজকের বাংলা ভাষার মুল ভিত্তি হলো আর্যভাষা। তিনি হাজার বছরের রুপান্তর ও অন্য তিন গোষ্ঠির ভাষার সাথে সংমিশণের  মাধ্যমে বর্তমান ভাষার উদ্ভব। আজ থেকে আড়াই তিন হাজার বছর আগে ইউরোপয়েড ধারার আর্যভাসী জনগোষ্ঠি ভারতে প্রবেশ করেই তাদের ভাষার প্রাঞ্চলতার সুবাদে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এদের মাধ্যমে ভারতে প্রথম আসে বৈদিক বা ঋগ্বেদের ভাষা। এরপরে আর্যভাষা পাঞ্জাব থেকে উত্তর ভারত হয়ে বিহার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল, খ্রীষ্টপুর্ব ১০০০ থেকে ৬০০ সালের মধ্যে। সাধারণে সংস্পর্শে এসে বৈদিক ভাষার ব্যাকারণের জটিলতা কিছুটা সরল হয়ে যায়। সাথে সাথে কথ্যভাষাও এর প্রবাবে বদলাতে থাকে। এ পর্যায়ে আর্যভাষার আওতাধীন বিস্তৃত অঞ্চলের পশ্চিম আর পুর্বের ভাষায় বেশ পার্থক্য দেখা দিল। পরিবর্তনটা এলো পুর্বের ভাষায়। ভাঙ্গন দেখা দিল আদি আর্যভাষায় এবং সৃষ্টি হলো প্রাকৃত ভাষার। পরবর্তীতে এই ভাষা পুরোপুরি প্রাকৃত আদল নিয়ে দুটি স্বতন্ত্র রুপ পেয়েছে পশ্চিমাঞ্চলের প্রাচ্য আর পুবাঙ্গলের প্রাচ্য। মগদে বলা হলো বলে শেষোক্তির নাম দেয়া হয় মাগাধি। মাগধি প্রাকৃতের কিছু সাহিত্যিক নির্দশন আরও পরের সংস্কৃত নাটক, যেমন মৃচ্ছকটিক এবং বররুচির ব্যাকরণে পাওয়া যায়। পরবর্তী সাতশ বছরে মাগধি প্রাকৃত ধীরে ধীরে বদলে একটি অপভ্রংশ ভাষার উদ্ভব হয়েছিল। এই অপভ্রংশই শ্রমে বিহারী (ভোজপুরি, মৈথিলি, মাগধি), বাংলা, অসমিয়া আর উড়িয়াতে পরিণত হচ্ছিল। অর্থাৎ অপভ্রংশে পরের ধাপেই বাংলা ভাষার কাল শুরু হয়। নবম-দমশ শতাব্দির দিকের চার্যাপদে নবীন বাংলা ভাষার আবির্ভাব ঘটলো। এটাকে ভাষাতাত্বিকরা বাংলা ভাষার আদিপর্ব বলেন। ১২০৩ খ্রিষ্টাবব্দে তুর্কি বিজয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু দিনের জন্য স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। চর্যাপদের কালের প্রায় দেড়শ বছর ব্যবধানে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দে রচিত বাংলা ভাষার আদি মহাকবি চন্ডিদাসের শ্রীকৃষ্ণর্কীতন এই বন্ধাত্বের অবসান ঘটায়। এই ভাবে শুরু হয় বাংলা ভাষার মধ্য পর্ব। পঞ্চদম থেকে অষ্টাদশ শতাব্দি পর্যন্ত ছিল বাংলা ভাষার মধ্যযুদের অন্তিমপর্ব। এ সময় চৈতন্যদেবের সমাজ বিপ্লব এবং বাংলার স্বাধীন সুলতানদের ঔদার্য ও পৃষ্ঠপোষকতার ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে নতুন জোয়ার আসে। বাঙালি কবিরা সৃষ্টি করেন পদাবলী কীর্তন, ধর্মসাহিত্য, মঙ্গল সাহিত্য, প্রণয়োপাখ্যান ও পুঁথিসাহিত্য। বাংলা ভাষার আধুনিক যুগ শুরু হয় অস্টাদশ শতাব্দি থেকে। তবে উনবিংশ শতাব্দিতে এসেই ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক সত্ত্বা পেয়েছে। আধুনিক বাংলা ভাষার স্থপতিদের মধ্যে প্রদান প্রধান ব্যক্তিরা হচ্ছেন ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসুদর দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ। তাহলে বাংলা ভাষার বংশ পাঠিকা হচ্ছে- বৈদিক কথ্য ভাষার একটা রুপ>প্রাচ্য অঞ্চলের কথ্যভাষা>মাগধি প্রাকৃত.মাগধি অপভ্রংশ> প্রাচীণ বাংলা (চর্যাপদের ভাষা)> মধ্যযুদের বাংলা> আধুনিক বাংলা।

বাংলা ভাষার মুল উপাদান হল সংস্কৃত উদ্ভুত তৎসম, অর্ধ-তৎসম এবং তার থেকে উত্থিত তদ্ভব শব্দ। আর মুল দেশী শব্দ যা হতে পারে কোন ধারার অষ্ট্রিক কিংবা দ্রাবিড়। ভাষার দিক থেকে বহুকাল হতেই বাংলাভাষী অঞ্চলের সুস্পষ্ট চারটি ভাগ ছিল: ১. রাঢ়-সুক্ষ। ২. বরেন্দ্র-পুন্ড্র, ৩. বঙ্গ-সমতট, ৪. কামরুপ-প্রাগজ্যোতিষ। মাগধি প্রাকৃত ও অপভ্রংশের যে বিভিন্ন রুপের ভিত্তিতে এই চারটি বিভাগ তার মুলে আঞ্চলিক ভাষাগুলো হলো যথাক্রমে, রাঢ়ী বরেন্দ্রী, বাঙ্গালী এবং কামরুপী। এর মধ্যে ভাষার প্রচলন ছিল রংপুর, দিনাজপুরের,  নীলফামারী , ডোমার অংশবিশেষ এবং ভারতের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কুচবিহার, ধুবড়ী প্রভৃতি এলাকায়।

নীলফামারী জেলার ডোমার অধিবাসীদের মুল ভাষা বাংলা। শিক্ষিতজনের মধ্যে ইংরেজীর প্রচলন আছে। স্বল্প সংখ্যাক অবাঙ্গালী অধিবাসী উর্দু ভাষা ব্যবহার করে থাকে। আর সাওতালরা ব্যবহার করে তাদের নিজস্ব সাওতালী ভাষা। ডোমার উপজেলার ব্যবহৃত বাংলা ভাষার সহজবোধ, অর্থবহ, সহজ উচ্চারণযোগ্য, সাবলিল এবং শ্রুতিমধুর। এগুলোতে আছে সভ্য সমাজে ব্যবহারযোগ্য প্রচুর শব্দ, প্রবাদ ও গান। আর এগুলো ধারণ করে আছে নানা দর্শন এবং চিন্তা-চেতনা। কোন কোন ক্ষেত্রে নিরক্ষর রচয়িতার ভ্রান্ত ধারনার ছাপ রয়ে গেলেও ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।

 

অসংখ্যা আঞ্চলিক শব্দের প্রচলন রয়েছে এই জেলার ভাষায়। এগুলো সিলেট কিংবা নোয়াখালীর মত দুর্বোধ্য না হলেও এগুলোর ভিন্নতা স্পষ্ট। কিছু শব্দ দেখলেই এটা বোধগম্য হবে:

 

 

প্রকৃত শব্দ

 ডোমার অঞ্চলের শব্দ

সন্তান

ছাওয়া/ছ’ল

পুত্র সন্তান

ব্যাটা ছাওয়া/ছ’ল

কন্যা সন্তান

বেটি ছাওয়া/ছ’র

উঠোন

আগিনা

খাবার পরিবেশন

পশ্যেন

ভান করা

ঢং করা বা কুয়ারা

অল্পবয়সী ছেলে

বাউ/ছোট্ট ছ’ল

রাস্তা

ঘাটা

হামাগুড়ি

হাংগুড়া

পেয়ারা

টাম/শব্রি

পান/সুপারি

গুয়া/পান

কামরাঙ্গা

কারেঙ্গা

অপরিচ্ছন্ন ব্যক্তি

গ্যাদরা/মানুষ

অলস ব্যাক্তি

আলসিয়া

লম্বা

ঢাংগা

বেটে

বাংটু

এখানে/ওখানে

 এইঠে/ওটাই/এটে/ওটে

 

 

 

 

‘আমি’র বদলে ‘মুই’  এবং তুমি’র বদলে তুই এর ব্যবহার ব্যাপক। আর বহুবচনে ‘আমরা’র জায়গায় হামরা তোমারা’র জায়গা তোমার কিংবা আমাদের বদলে হামার ঘরোক ব্যবহৃত হয়। গ্রামাঞ্চলে সন্তানদের নাম রাখার ক্ষেত্রে অনেক সময় গায়ের রং বা চেহারাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। যেমন-ধলি(ফর্সা বা ধরা হলে), কালটি (কালো হলে), চেপটি, শিয়ালু গাড়োয়া, কালচু প্রভৃতি।

ডোমার অঞ্চলের প্রচলিত ভাষায় নিরক্ষর মানুষদের মুখে মুখে অসংখ্য প্রবাদ প্রচলিত আছে যেগুলো কোন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়নি। অথচ সেগুলোর রয়েছে নানা অর্থপুর্ণ দিক কিংবা দার্শনিক যুক্তির ছোয়া। এর মধ্যে অনেক শ্রুতিকটু শব্দের ব্যবহার থাকলেও এগুলোর তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরীসিম। যেমন ‘ চোরের মায়ের ডাঙ্গর গলা বা যার বাপ খাইছে রাস্তার মুড়িকুড়ি, তার ছাওযাল চালে রাস্তার উপর জুতার ফড়ফড়ি, ইত্যাদি। কোন কোন শব্দের ক্ষেত্রে রেফ এর ব্যবহার না করে উচ্চারিত হয় বর্ষা>বষষা, ধর্ম>ধম্ম। আবার প্রায়শই ‘র’ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দ উচ্চারণে ‘র’ এর জায়গায় ‘অ’ ‘রা’ এর জায়গায় ‘আ’ উচ্চারিত হয়। যেমন লাট>নাট, লাগে>নাগে প্রভৃতি। আবার কোন ক্ষেত্রে কোন অক্ষরের উচ্চারণ উহ্য থাকে-কাহিলা>কাইল্যা, থাকুক>থাউক। ‘ব’ এর স্থলে ‘ভ’ উচ্চারিত হয় পাখির বাসা>পাখির ভাষা। অনেক সময় ‘ও’ যুক্ত হয় উচ্চারণের সময়। যেমন- পা>পাও, গা>গাও। আবার শব্দের মধ্যে একটি অতিরিক্ত ‘ই’ যুক্ত হয়। যেমন- খেলি>খেইলি, বোন>বোইন। সাধারণত ‘বাপুহে’ এর স্থলে ‘বাহে’ ব্যবহৃত হয়। আবার অনেক সময় কাউকে সম্নোধন করতে ‘বাহে’র ব্যবহার করা হয়। যেমন কোথায় যাবে?>কোনটে যাবে বাহে? কেমন আছেন?> ক্যাংকা আছেন বাহে? কিছু শব্দের ডোমার অঞ্চলের শব্দরুপে দেখা যাক:

 

একবচন

বহুবচন

আমি>হামি, মুই

আমরা>হামরা

আমাকে>আমাক, হামাক, মোক

আমাদের>হামার ঘরোক, হামাক

ওরা>ওমরা

ওমরা, ওমাক ঘরে

ওদের>ওমাক

ওমরা ঘরোক।

 

এ পর্যায়ে কিছু বাক্যের আঞ্চলিক রুপ প্রত্যক্ষ করলে আমাদের সামনে বিষয়টি আরও পরিস্কার হবে। একজন মানুষের দুই ছেলে ছিল>একজন মানুষের দুইকনা ছ’ল আছিল।

 

তিনি দুই ছেলের মধ্যে টাকা-পয়সা ও জমিজমা ভাগ করে দিলেন> তাই দুই ছলের মইদে টাকা পয়সা, জমি জিরাত ভাগকরি দিলেন। বড় ছেলে জমা বেuঁচ গ্রাম ছেড়ে চলে গেল>বড় ছলটা জমি জিরাত বেচি গাও ছাড়ি চলি গেল। ওখানে গিয়ে জমি কিনলো> ওটে যায় জমি কিনলো।

কাউকে ছেড়ে কথা বলার মানুষ আমি নই> কাকো ছাড়ি কথা কবার মানুষ মুই নোয়াম। তুমি ওখানে গিয়ে কিছুই পাবে না> তুই ওটে যায়া ঘন্টা পাবু।

ডোমার  থানার ইউনিয়নগুলোর ভাষার মধ্যেও কিছু কিছু পার্থক্য লক্ষ করার যায়। ডোমার থানার ভাষার অন্য কোন অঞ্চলের প্রভাব সচরাচর দেখা যায় না। তবে এই থানার পুর্বাঞ্চল বিশেষ করে চরাঞ্চলের ভাষা একটু ভিন্নতর। ঐ অঞ্চলের লোকদের কথোপকথনে একটা দীর্ঘটান এবং অবোধ্যতা লক্ষণীয়্ যেমন তারা গায়ের চাদরকে বলে গিলাপ। না বোধক শব্দের ভঙ্গিও আলাদা। যেমন খাব না> ন খাইয়ম। জেলার উত্তরের উপজেলা সুন্দরগঞ্জ এর মানুষ কিছুটা টেনে কথা বলে এবং মুই, তুই, যাও, কোনটে ইত্যাদি কথ্য শব্দের ব্যাপক ব্যবহার করে থাকে। সাদুল্যাপুর উপজেলায় ব্যবহৃত ভাষায় তেমনকোন ব্যতিক্রম নেই। পলাশবাড়ীর ক্ষেত্রে একই কথা বলা যায়। তবে এ সেখানে বসবাসরত কিছু সংখ্যাক সাওতাল তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। এরা বাংলাও বলতে শিখেছে। গোবিন্দগঞ্জ বাসীদের ব্যবহতৃ ভাষায় বগুড়া জেলার ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ক্রিয়াপদের সাথে ‘উ’ প্রত্যয়ের ব্যবহার করতে দেখা যায। যেমন- যাচ্ছু, খাচ্ছু, করিচ্ছু। সাঘাটা অঞ্চল বিশেষে বগুড়ার টান লক্ষ্যনীয়। আর ফুলছড়ি অধিকাংশই চরাঞ্চল। চরাঞ্চলের লোকজনের ব্যবহৃত ভাষায় জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলার ভাষার প্রভাব বিদ্যমান। এদের উচ্ছারণে ‘ছ’ এর বাহুল্য রয়েছে। যেমন বসে আছি>বছি শুয়েছি>সুছি আবার কিছু দুর্বোধ্য শব্দও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন বসে আছি>বছি শুয়েছি> সুছি আবার কিছু দর্বোধ্য শব্দও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন ওখানে>ওহেন, তোমাদের>তংগরে, আমাদের>আংগরে, আসেন>আহেন।

এদেশের মানুষের ভাষা বাংলা। পৃথিবীতে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দানের অহংকার রয়েছে একমাত্র বাঙলীর। তাই বাংলা ভাষা আমাদের অর্জিত গৌরব এবং সহজাত অধিকার দুটোই। দেশের অংশ হিসেবে ডোমার বাসীও এ অধিকারের অংশীদার। এ জেলার ভাষা সহজ-সরল, পরিচ্ছন্ন ও বোধগম্য। এ উপজেলায় আঞ্চলিক ভাষা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র উপস্থাপন করে কিছুটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। এটি একটি ক্ষদ্র এবং অসম্পুর্ণ প্রয়াস। ভবিষ্যত উৎসাহী কেউ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে এ বিষয়ে আরও সমৃদ্ধ লেখা উপহার দিলে এর পুর্ণতা প্রাপ্তি ঘটবে।

 

 

 

 

 

 

‘সংস্কৃতি’ বহতা নদীর মতো প্রবহমান। নতুন নতুন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির প্রবাহ সচল থাকে। চলমানতার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি কল্যাণকর হয়ে থাকে। মানব জীবন যেমন যুগের প্রেক্ষিতে পরিবর্তনশীল ঠিক তেমনিভঅবে ‘সংস্কৃতি’ ও পরিবর্তিত হয়ে থাকে। জন-জীবনের সাথে সংস্কৃতির আত্মিক সম্পর্ক দৃঢ়ভাবে নিবন্ধ। টি.এস. ইলিয়ট সংস্কৃতিকে দেখেছেন জীবন পদ্ধতি হিসেবে। বোয়া ও টাইলর ‘জেনারেল অ্যানথ্রোপলজী’ ও ‘প্রিমিটিভ কালচার’ এ সংস্কৃতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন জীবন পদ্ধতির যাত্রা পথে যে সৌন্দর্য চেতনা মানব মনকে সৌন্দর্য সীমানার স্বর্ণদুয়ারে পৌছে দেয়, মানুষের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে তোলে, মূলত তাই সংস্কৃতি। তাহলে আমরা একথা বলতে পারি যে, ‘সংস্কৃতি হচ্ছে সংস্কার’ বা Refrom অথবা নবতর সৌন্দর্য চেতনা। যা মানুষের সুকুমার বৃত্তিকে সযত্নে লাল করে। ‘সংস্কৃতি’ ও লোক-সংস্কৃতি দুটোই পরস্পর পরিপূরক। একটির সাথে অপরটির সম্পর্ক আলো-অাঁধারের মতো। জীবনকে বাদ দিয়ে কোনটির অস্তিত্ব নেই। একটি হচ্ছে অতি মার্জিত জীবন সঙ্গীত, অন্যটি জীবন সঙ্গীত। লোক-সংস্কৃত হচ্ছে আমাদের দারিদ্র, পশ্চাৎপদতা এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত জন সাধারণের হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতি। (১। ধাঁধাঁ (২) ছড়া (৩) মন্ত্র (৪) প্রবাদ বা প্রবচন (৫) প্রচলিত গান (৬) খেলাধুলা (৭) লোক কথা ইত্যাদি বিষয় লোক-সংস্কৃতিকে সম্যকভাবে উপলব্ধি করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উপাদান বলে গণ্য হতে পারে।

ধাঁধাঁ বা ‘শ্লোক’ সম্পর্কে ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ এর মধ্যবর্তী সময়ে গ্রাম দেশে একটি কৌতুককর দিক প্রচলিত ছিল। তা হলো কেউ যদি শেলং বা শ্লোক ভাঙ্গাতে না পারতো তা হলে তাকে নাজুক পরিস্থিতির শিকার হতে হতো। সম্ভবত এ ধারণাটি আরব দেশ থেকে এখানে এসেছে।

‘আরাত থ্যাইকা’ শব্দদুটি বাঁশবন এবং থেকে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর যথার্থ উত্তর কলার মোচা (গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষায় একে থোড় বলে)। পাখির পাশাপাশি গাছও ধাঁধাঁরা সাথে জড়িয়ে আছে। কবিরা যেমন প্রকৃতি বা নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে ভিত্তি করে কবিতার অবকাঠামো নির্মাণ করেন, অনুরূপ চিন্তা চেতনায় না হলেও বৃহত্তর গ্রামীণ সভ্যতার মানুষ দৃশ্যমান যা কিছু দেখেন সেখান থেকেই উপকরণ সংগ্রহ করে ‘ধাঁধাঁ’ রচনা করতে প্রবৃত্ত হন। যেমন:

 

 

লোক সাহিত্যের আর একটি শাখা গ্রাম বাংলার বৃহত্তর জনপদে ছড়িয়ে আছে তা হলো মেয়েলী গীত বা মেয়েলী সংগীত। এর মাধুর্য ও স্বাদ হলো ভিন্নতর। প্রকৃতির মাঝে এর সম্পর্ক পান ও চুনের মতো। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো গীতগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাব প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন কাব্যেও এর সাক্ষাৎ পাওয়া যায় ভিন্ন আঙ্গিকে। প্রাচীনকাল থেকে অধুনা পর্যন্ত মেয়েলী গীতের প্যাটার্নে কোন পরিবর্তন বা রূপান্তর লক্ষ্য করা যায় না। নদীর মন্থর গতি, পাতার মর্মর ধ্বনি, পাখীর গান, বাঁশীর সুর এতে প্রত্যক্ষ করা যায়।

 

 

বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের গীত আর রাজশাহী অঞ্চলের গীতের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য দেখা যায় না। কেবল মাত্র ভাষার ভিন্নতা ছাড়া ভাবার্থের তেমন কোন পরিবর্তন দৃষ্টি গোচর হয় না।নীলফামারী জেলার নিভৃত পল্লীতে বা শহরতলীতে মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের বিয়ে অনুষ্ঠানে পাড়াপরশীকে দল বেঁধে গীত গাইতে দেখা যায়। যেমন:

গাও তোল গাও তোল কন্যা হে

কন্যা পেন্দ বিয়ার শাড়ী

সেই শাড়ী পিন্দিয়া

তোমরা যাইবেন শ্বশুর বাড়ী কন্যা হে।

 

বর পক্ষের দেয়া শাড়ী পড়বার জন্য কন্যাকে বারংবার অনুরোধ  জানানো হয় নানা ভঙ্গিতে। লজ্জাবনতে মুখে কন্যা দু-একজনকে দেখে নয়, অত:পর সে তার জন্য আনা শাড়ী পড়ে। শাড়ী পড়া হলো তখন কন্যা পক্ষের মেয়েরা তাদের অভিযোগ এভাবে প্রকাশ করে।

দই আনে নাই দামালের বহনাই

নাখে নাগাও দড়ি

নাখেরে বিষে বিষে

বেড়ায় গলি গলি

গীদালী না কও গে

বুবু করিয়া ডাকাও গে

নাখের দড়ি খলেয়া দে

দেছো দই আনিয়া গে

মিঠাই আনে নাই দামাদের ফুপা

কানেনাগাও দড়ি।

 

লতার বিয়ে। বাবা অবস্থাপন্ন নয়। তবুও পাত্রস্থ করতে হবে। দিনক্ষণ সব ঠিক। পাড়াপরশী সবাই মিলে লতার বিয়ে দেবে। সেখানে গীদালীরা গান গায়-

কুয়ার পাড়ে মিষ্টি কারেঙ্গার গাছ গো মা

তার তলে গোসল করে হামার লতায় মা

তারি উপর তলায় আয়নাল বাজায় বাঁশী গো মা

সেই বাঁশীরও মধ্যে লতা লতা করে গো মা

লতার মন কয় সাবান ফিকা মারম গো মা।।

 

অনেকটা কতোপকথনের ধারায় আর একটি গীত-

দেও দেও বাবা রঙ্গিলা সোয়ামী

কোনঠে পামরে বেটি রঙ্গিলা সোয়ামী

খোঁজ খোঁজরে বাবা হাটেরও চতুর পাকে

খোঁজ খোঁজরে বাবা বাজেরেরও চতুর খানি

যার মুখে আছে ক্যাচি কাটা দাড়ি

তারে করব আমি শশু কালের সোয়ামী

দেও দেও বাবা রঙ্গিলা সোয়ামী।।

 

হিন্দু বিয়ে অনুষ্ঠানে সাধারণত অগ্রহায়ণ, মাঘ, ফাল্গুন, বৈশাখ, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে সম্পন্ন হয়ে থাকে। পঞ্জিকা মাস অনুমারে তিথি বা ক্ষণ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। হিন্দু বিয়েতে লগ্নের গুরুত্ব সর্বাধিক। লগ্ন পার হয়ে গেলে অনেকা সময় বিয়ে ভেঙ্গে যায়। সে জন্য অত্যন্ত সতকর্তার সাথে সব কিছু অনুসরণ করা হয়। হিন্দু বিয়েতে ‘হলুদ প্রস্ত্ততি পর্বে’ এতদঞ্চলের যে হীতটি সুরে সুরে উচ্চারিত হয়-

হলতি তোলো হলদি

তোলো মাটির হলদি

কে দেবে বাছার গাছে হলদি

বাবা হামার বিবাদী

মাও হামার দরদী

তাই দেবে বাছার গায়ে হলদি।।

 

হলুদ প্রস্ত্ততির পর বরের সারা শরীরে হলুদ মাখাবার সময়ে গিদালীর কণ্ঠে আমরা যে গীত প্রায়শ: শুনে থাকি-

হলদিরে ডগমগ

তেলেরই সোয়ারী

কে দেবে বাছার গায়ে হলদি

চীপ বয়া পরে বাছার ঘাম

ওরে

কুনতী গেল তোর দয়ার বাবারে

গামছায় মুছিয়া রাখ ঘাম

ওরে।।

 

হলুদ অনুষ্ঠানে পাড়াপরশী ও নিকট আত্মীয় স্বজনকে আমন্ত্রণ জানানোর রীতি নতুন নয়। আমন্ত্রিত অতিথিরা বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলেও সকলেই হলুদ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে সম্মত হয়। আর তখনই ‘কে দেবে বাছার গায়ে হলদি’’- এই ভাবে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।

হলুদ অনুষ্ঠান শেষ যখন বরানুগমন পর্ব শুরু হয় তখনও আমরা গাইবান্ধা শহরের হিন্দু পল্লীতে মেয়েদের কণ্ঠে শুনতে পাই-

হাত পাও ধুইয়া মনিরাজ

মাও বলিয়া ডাকে গো

মাও কি খাইয়া যাম শুশ্বর দেশে

ঘরেতে আছে বাবা (২)

পঞ্চ গাভীর দুধও গো (২) বাবা তাকো খায়া

যাও গো শ্বশুর দেশে গো

সেও না দুধও খাছে বাছুরে

বাবা হামার কি ভায়া যাবে গো

শ্বশুর দেশে গো।

 

সন্তানকে শ্বশুর বাড়ি পাঠাবার পূর্বে মা ভাবে খাঁটি দুধ খেয়ে তার ছেলে শ্বশুর বাড়ির পথে রওনা হবে। কিন্তু দুধের সন্ধানে গিয়ে দেখে বাছুর গরুর দুধ খেয়ে বসে আছে। এখন তার ছেলে কি খেয়ে যাবে শ্বশুর বাড়ি?

বিয়ের শেষে নব পরিণীতা বধুসহ বর যখন স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করে তখন আবার গিদালীরা কণ্ঠে শোনা যায়-

পূর্বে ঝাকি দিল গজ মতি তারা

হাতে নাই মোর শঙ্খ, কোমরে নাই মোর শাড়ি

কি মতে বরিয়া নিমো বেন্না শালার বেটি।।

 

মুসলমান ও হিন্দু বিয়েতে নানা ধরণের গীত গাওয়া হয়ে থাকে। সংগৃহীত গীতগুলো নানা দোষে দুষ্ট। শব্দগুলোকে অপরিবর্তনীয় রেখে হুবহু অনুসরণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, মেজবাহ মাস্টার, কুঞ্জুবালা, শঙ্কলী মোহন্ত এবং ননী বালা বিশ্বাসের মুখ নি:সৃত কথা মালায়। শব্দগুলোকে যদি আধুনিক ধাঁচে নির্মাণের চেষ্টা করা হয় তাহলে হয়তো এর ভাবার্থে ক্ষুন্ন হবে।

নদী, নারী ও নৌকার সাথে বাংলঅর বৃহত্তর জনপদের পরিচিত আজ নুতন নয়। শত বছর আগেও নৌজার প্রচলন ছিল বহুল পরিমাণে। বাংলার নদী মাতৃক দেশ। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন কাব্যে নৌকার পরিচিত ছিল আমরা বিভিন্নভাবে পেয়ে থাকি। যদিও আলোচনার প্রেক্ষিতে ভিন্ন। এখানে নৌকা বাইচ খেলা ও তার গান নিয়ে কথা। আমাদের গাইবান্ধা শহরে বৎসরের বিশেষ সময়ে অর্থাৎ আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে জাঁক জমকের সাথে নৌকা বাইচ খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রতিযোগিতায় অসংখ্য মানুষের সমাবেশ ঘটে। দীর্ঘকায় নৌকা মাঝি মাল্লারা নানা সাজে সজ্জিত হয়ে জলতরঙ্গ গান ধরে। যেমন:

নয়া নাও নয়া বৈঠা, বৈঠার

মাথায় ঝুনি ফি; নাও বানাইছে

নবেছ মিস্ত্রি। নৌকা ভাসিল,

ভাসিল অগম শহরে ডিংগা ভাসিল।

গোড়া পানিতে নামি

কন্যা গোড়া মানঝন করে,

হাটু পানিতে নামি কন্যা হাটু

মানঝন করে। জঙ্গলে বসি

কন্যা হা-হুতাস করে।

 

অন্য আর এক নৌকা থেকে উত্তর আসে-

ঢেউ লাগিয়া কলসি ভাংগে

কান্দা রহিল মোর হাতেতে

আর যাব না জলের ঘাটেতে।

গোড়া পানিত নামিয়া

কন্যা গোড়া মাজন করে রে

আর যাব না জলের ঘাটেতে।।

গলা পানিত নামিয়া কন্যা

গলা মাজন করে রে

আর যাব না জলের ঘাটেতে।